শনিবার | ৮ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | হেমন্তকাল | ২৪শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

শক্তিশালী প্রশাসন বনাম দাপুুটে এমপি

ক্ষমতার দাপট কখন কখনও কাউকে বেপরোয়া করে তোলে এবং সেটা তার জন্য বিপদও ডেকে আনে, নিক্সন চৌধুরী তার জ্বলন্ত উদাহরণ।

‘নিক্সন চৌধুরী ধরা’ – এটা ফেসবুকের ভাষা হয়ে গেলো কি? না, একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি সম্পর্কে এমন মন্তব্য করা হয়তো সমীচিন নয়। কিন্তু টেলিফোনের কথপোকথন শুনলে মজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরী সম্পর্কে যে কেউই তার প্রতি ক্ষুদ্ধ হবেন। আর এলাকার মানুষ যারা তার ‘বাণী’ শোনেন নিয়মিত, তারা বলবেন যে তাদের এলাকার এমপি এমন করেই কথা বলেন। আর জোর গলায় কথা বলে, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে ভাষণ দিতে অভ্যস্থ নিক্সন চৌধুরীর জনপ্রিয়তা যে আছে, তাও কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না।

এমপি স্বতন্ত্র। কিন্তু গলার আওয়াজ বা এলাকায় দাপট কোনোটা কম নয়। এর কারণও আছে। বড় ভাই নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন সংসদে সরকারি দলের চিফ হুইপ। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর সাথেও আছে আত্মীয়তা। আর ভোটে হারিয়েছেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাফরুল্লাহকে, তাও ৫০ হাজার ভোটে। নৌকা প্রতীকে জাফরুল্লাহ চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯৫ হাজার ৩৬৩ ভোট আর সিংহ মার্কা নিয়ে নিক্সন চৌধুরী পান ১ লাখ ৪৫ হাজার ভোট।

বলা যায়, বেপরোয়াই ছিলেন ভাঙ্গা ও চরভদ্রাসন উপজেলা নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-৪ আসনের এই সংসদ সদস্য। কিন্তু পঁচা শামুকে পা কাটার যে প্রবাদ আছে, তাই যেন সত্যি হলো মজিবুর রহমান চৌধুরী ওরফে নিক্সন চৌধুরীর ক্ষেত্রে। নিজের নির্বাচন নয়, চরভদ্রাসন উপজেলা উপনির্বাচনে ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে ধরা পড়া নিজের কর্মীকে ছাড়াতে এসি ল্যান্ড, ইউএনও আর জেলাপ্রশাসককে ‘গালিগালাজ’ করার জন্য নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘনের দায়ে মামলা হয়েছে নিক্সন চৌধুরীর বিরুদ্ধে। আর এই মামলা করতে ঢাকা থেকে ফরিদপুর গিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের কর্মকতারা। তারা নিক্সন চৌধুরীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘনের অভিযোগও তদন্ত করেছেন।

একজন সংসদ সদস্য, যিনি জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের কমকর্তাদের সঙ্গে বিবাধে জড়ানো তার জন্য শোভন নয়। কিন্তু ক্ষমতার দাপট কখন কখনও কাউকে বেপরোয়া করে তোলে এবং সেটা তার জন্য বিপদও ডেকে আনে, নিক্সন চৌধুরী তার জ্বলন্ত উদাহরণ।

গত ১০ অক্টোবর চরভদ্রাসন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদের উপনির্বাচনে আচরণবিধি লংঘনের অভিযোগে নিজের এক সমর্থক আটক হওয়ায় ক্ষুদ্ধ হন নিক্সন চৌধুরী। তাকে ছাড়াতে ফোনে গালিগালাজ করেন তিনি। রাতে এলাকায় গিয়ে জনসভায় বিষোদগার করেন জেলাপ্রশাসনের বিরুদ্ধে।

এরই মধ্যে ইউএনওর সঙ্গে এমপির টেলিফোন সংলাপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এটিকে এমপি বলেছেন ‘সুপার এডিটেড’ আর ইউএনও জানিয়েছেন টেলিফোন সংলাপ কিভাবে ফাঁস হলো তা তিনি জানেন না।

ঘটনাটিকে সিরিয়াসলি নেয় অ্যাডমিনেস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। তাতেই ‘ধরা খেয়েছেন’ নিক্সন চৌধুরী। দেশের প্রশাসন চালান যারা, সেই মাঠের ম্যাজিস্ট্রেট থেকে শুরু করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব পর্যন্ত সবাই এই অ্যাসোসিয়েশন সদস্য। বলা যায়, তারা সবাই নিক্সন চৌধুরীর আচরণে ক্ষুদ্ধ হয়েছেন। ফলে নির্বাচন কমিশনকে দ্রুতই ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।

অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি স্থানীয় সরকার সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ আর মহাসচিব জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুন। চরভদ্রাসন উপজেলার ঐ ঘটনার পর অ্যাসোসিয়েশনের বৈঠকে বিষয়টিতে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে এ সম্পর্কে ‘সরকারি কর্মচারীবান্ধব প্রধানমন্ত্রীর’ হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।

নিক্সন চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এমপি হয়েছেন বটে, তবে সরকারেও তার প্রভাব আছে। এলাকায় জনসমর্থনও যথেষ্ঠ। আর সে জন্যেই ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে পরপর দুবার তিনি স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়লাভ করেছেন। ২০০৮ সালে এই আসনেই এমপি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরুল্লাহ চৌধুরীর স্ত্রী।

কাজী পরিবার ভাঙ্গার অন্যতম প্রভাবশালী। সেই পরিবার এবং কাজী জাফরুল্লাহকে চ্যালেঞ্জ করে রাজনীতি করা সহজ নয়। তবে নিক্সন চৌধুরীও কম যান না। তার বাবা ইলিয়াস চৌধুরী দৈনিক বাংলারবাণীর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি। বঙ্গবন্ধুর সাথে তার আত্মীয়তা। বড়ভাই নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন কয়েকবার আ্ওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমপি হয়েছেন মাদারীপুর থেকে। সম্প্রতি নিক্সন চৌধুরী বিয়ে করেছেন সাবেক মন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মেয়েকে, যিনি যুক্ত হয়েছেন ইত্তেফাক পরিচালনার কাজে।

নিক্সন চৌধুরীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘনে মামলার বিষয়টি আরেকটি কারণে গুরুত্বপুর্ণ। নিজেদের নির্বাচনী এলাকায় স্থানীয় সরকারের পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে এখন দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হচ্ছে। কিন্তু জেলা বা উপজেলায় দলীয় কমিটির সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক হলেও এমপি হ্ওয়ার কারণে অনেকে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারেন না।

স্থানীয় পর্যায়ে এমনকি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরও অনেক নেতার অভিযোগ, সরকার অতিমাত্রায় প্রশাসননির্ভর হয়ে উঠছে। আবার অনেক এলাকায় দেখা যাচ্ছে, উপজেলা পরিষদের সাথে ইউএনও বা জেলা পরিষদের সাথে জেলা প্রশাসনের দূরত্ব বা বিরোধ আছে। নিক্সন চৌধুরীর ঘটনায় এ বিষয়টিও সামনে এসেছে, যদিও ভাঙ্গা একটা ব্যতিক্রম। কারণ এখানে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগ নিক্সন চৌধুরীর বিরোধিতা করে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকতার সাথে বিরোধের ঘটনায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নিক্সন চৌধুরীর বিরোধিতা করে জেলা প্রশাসনের সাথে মতবিনিময়ে নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘনের বিচার চেয়েছে। কিন্তু যখন নির্বাচন কমিশনের কমকর্তারা ফরিদপুর গিয়েছেন মামলা করতে, তখন ভাঙ্গায় নিক্সন চৌধুরীর পক্ষে-বিপক্ষে মানববন্ধন হয়েছে। ঘটনা অনেক দূর গড়াবে সন্দেহ নাই। তবে একজন জনপ্রতিনিধির বেপরোয়া, দাপুটে মনোভাব বনাম জনপ্রশাসনের অবস্থান কিন্তু চিন্তিত করছে ভবিষ্যত রাজনীতি নিয়েই।

সূত্র: ডিবিসি নিউজ

বিডি রয়টার্স/এইচ এ

Translate »