অবৈধ ইটভাটা রক্ষায় জনপ্রতিনিধিরা

অবৈধ ইটভাটা রক্ষায় জনপ্রতিনিধিরা

চট্রগ্রাম: জেলা-উপজেলার ইটভাটা মালিক সমিতির নেতৃত্বে রয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, ইউপি সদস্যসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। এমনকি সাংসদ বা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদেরও নামে–বেনামে ইটভাটা রয়েছে।

হাইকোর্টের নির্দেশে চট্টগ্রামে অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদ কার্যক্রম চলছে। তবে তাতে অগ্রগতি কম। এর পেছনে ভাটার মালিক সমিতির প্রভাব অন্যতম। গত ফেব্রুয়ারিতে মালিক সমিতি সংবাদ সম্মেলন করে উচ্ছেদ বন্ধের দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল।

পরে তারা কর্মসূচি পালন থেকে সরে এলেও ভাটা উচ্ছেদের গতি বাড়েনি। উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও অর্থসংকটের কথা বলছে পরিবেশ অধিদপ্তর।স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের হাতে বৃহত্তর চট্টগ্রামের ইটভাটাগুলোর নিয়ন্ত্রণ।

ফলে অবৈধ ভাটায় ইট পোড়ানোর মাধ্যমে পরিবেশদূষণ থেমে নেই। পোড়ানো হচ্ছে বনের কাঠ। আবাসিক এলাকা, স্কুল–কলেজের পাশে ইটভাটার অবস্থান রয়েছে। ইটভাটার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, বিএসটিআইসহ কয়েকটি দপ্তরের ছাড়পত্র লাগে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় দেড় হাজার ভাটার অর্ধেকই অবৈধ।

হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের আইনজীবী মনজিল মোরসেদের একটি রিট আবেদনের পর হাইকোর্ট ১৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম অঞ্চলের সব অবৈধ ইটভাটা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন। এরপর বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় অভিযান শুরু হয়। তবে প্রথম দিকে কিছু ইটভাটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলেও অনেকগুলোকে জরিমানা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা হয়। পরে হাইকোর্ট আরেক আদেশে ইটভাটা উচ্ছেদ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দেন।

অবৈধ ইটভাটা রক্ষায় জনপ্রতিনিধিরা

আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ইটভাটাগুলোর মালিক হিসেবে থাকেন জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারা। নামে–বেনামে তাঁরা ভাটার মালিক হয়েছেন।

জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মুফিদুল আলম  বলেন, আদালতের নির্দেশে অভিযান চালাচ্ছি। এটা চলমান প্রক্রিয়া। সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগ করেও দিনে দুটি বা তিনটির বেশি ভাটা উচ্ছেদ করা যায় না। এখনো অনেক ইটভাটা উচ্ছেদ কার্যক্রম বাকি রয়েছে।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় সবচেয়ে বেশি ৩১১টি ইটভাটার তালিকা হাইকোর্টে জমা দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। তবে বাস্তবে ইটভাটা পাঁচ শতাধিক। যার অর্ধেক অবৈধ। চট্টগ্রামের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ায় যথাক্রমে ৬৮ ও ৩১টি ভাটা রয়েছে। এ ছাড়া রাঙ্গুনিয়ায় ৪৮ এবং ফটিকছড়িতে ৩০টি ইটভাটা রয়েছে।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি পৌর মেয়র ইসমাইল হোসেন। তিনি আবার চট্টগ্রাম ইট প্রস্তুতকারী মালিক সমিতির আহ্বায়ক। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি তাঁরা সংবাদ সম্মেলন করে অভিযানের প্রতিবাদে ইট বিক্রি বন্ধসহ নানা কর্মসূচির ঘোষণা দেন।

পরদিন মনজিল মোরসেদ এই কর্মসূচিকে আদালত অবমাননার শামিল উল্লেখ করে আইনি নোটিশ পাঠালে কর্মসূচি থেকে সরে আসে মালিক সমিতি। পরে মালিক সমিতি হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চেয়ে একটি আবেদন করে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম জেলার উপপরিচালক জমির উদ্দিন বলেন, অনেক জনপ্রতিনিধি ইটভাটা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ভাটাগুলোর বিরুদ্ধে কাঠ পোড়ানো, নিষিদ্ধ এলাকায় ভাটাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। যেগুলো অবৈধ সেগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। তবে অনেকগুলোর বিষয়ে প্রশাসনও জানে না।

কক্সবাজার জেলায় ১১০টি ইটভাটার মধ্যে প্রায় অর্ধেক অবৈধ। হাইকোর্টের আদেশের পর মাত্র ৭টি ইটভাটা গুঁড়িয়ে দিয়েছে কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তর কার্যালয়। ভাটার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫৪টি রামু উপজেলায়।

ইটভাটা মালিকদের মধ্যে বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যান, জেলা পরিষদের সদস্য ও রাজনীতিকেরা রয়েছেন। এখানে ভাটার মালিকদের জেলা কমিটি নেই। রামু ইটভাটা মালিক সমিতির সহসভাপতি হলেন ফাতেকারকুল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম এবং সাংগঠনিক সম্পাদক হলেন কক্সবাজার জেলা পরিষদের সদস্য নুরুল হক।

এ ছাড়া ফাতেকারকুল ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান ফরিদুল আলমেরও ইটভাটা রয়েছে। এগুলোর বৈধতা না থাকলেও তাতে আঁচড় পড়েনি।

জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক শেখ নাজমুল আলম বলেন, ইটভাটার অর্ধেক অবৈধ। অভিযানের জন্য লজিস্টিক সহযোগিতা ও অর্থ একটা বড় বিষয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অলক পালের তত্ত্বাবধানে মোহাম্মদ আলীম উল্লাহ খান নামে একজন এই গবেষণা করেন। গবেষণায় বলা হয়, ৪০ লাখ ইট তৈরিতে একেকটি চুল্লি থেকে প্রায় ৩৯৪ টন কার্বন, ১ হাজার ৪৪৪ টন কার্বন ডাই–অক্সাইড, ৬ দশমিক ৩ টন মিথেন ও ১০২ টন নাইট্রিক অক্সাইড নিঃসৃত হয়।

বিডি রয়টার্স/এ.সি