সিরাজগঞ্জে দুই সপ্তাহে বজ্রপাতে ১৯ জনের মৃত্যু

পঞ্চগড়ের আটোয়ারীতে বজ্রপাতে নারীর মৃত্যু

সিরাজগঞ্জ: গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সিরাজগঞ্জে বজ্রপাতে শিক্ষার্থী ও কৃষক সহ ১৯ জনের মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে মেডিক্যাল কলেজ ছাত্র সহ গৃহবধূরাও রয়েছেন । আহত হয়েছে আরও ৭ জন। এছাড়া বজ্রপাতে গবাদি পশু মৃত্যুর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সামান্য ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টিপাতের সাথে সৃষ্ট এই বজ্রপাতে এমন হতাহতের ঘটনা জেলার কৃষকসহ সাধারণ মানুষদের শঙ্কিত করে তুলেছে ।

সুত্র থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, গত বছরগুলোর তুলনায় এ বছরে সিরাজগঞ্জ জেলায় বজ্রপাতে মৃত্যু সংখ্যা অনেক বেশি। চলতি বছরে সিরাজগঞ্জ জেলায় সরকারী হিসাবে বজ্রপাতে নিহত হয়েছে ৩৫ জন এরমধ্যে গত ১ সপ্তাহে বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের। গত বছরের তুলায় এবছর মৃত্যুর সংখ্য দ্বিগুণ।

পরিবেশের এমন বিপর্যয়ের কারণ হিসাবে অভিজ্ঞ ও সচেতন মানুষ মনে করছেন সিরাজগঞ্জের এ অঞ্চলে নদী বেষ্টনি ও প্রচুর ফাকা জায়গা থাকলেও বড় বড় গাছপালা না থাকায় বজ্রপাতের অন্যতম কারণ । এই কারনেই জেলায় বজ্রপাতে হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে।

জলবায়ু ও আবহাওয়ার পরিবর্তন ও পর্যাপ্ত পরিমান গাছপালা না থাকায় প্রতিনিয়ত এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি বজ্রপাত থেকে রক্ষায় সাধারণ মানুষকে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা দরকার বলে মনে করছেন জেলার সচেতন মানুষ ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ বিশিষ্টজনেরা । একই সাথে তারা বজ্রপাতরোধে বিজ্ঞান সম্মত ব্যবস্থা গ্রহন সহ আরও বেশি সংখ্যক তালগাছ লাগানোর জন্য তাগিদ দিচ্ছেন।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে দক্ষিণ এশিয়ার যে দেশগুলোয় বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি, তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশও। বাংলাদেশে বজ্রপাতের মূল কারণ দেশটির ভৌগলিক অবস্থান। বাংলাদেশের একদিকে বঙ্গোপসাগর, এরপরই ভারত মহাসাগর। সেখান থেকে গরম আর আর্দ্র বাতাস আসছে। আবার উত্তরে রয়েছে পাহাড়ী এলাকা, কিছু দূরেই হিমালয় রয়েছে, যেখান থেকে ঠান্ডা বাতাস বইছে। এই দুই বাতাসের সংমিশ্রণ বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।

জেলার রায়গঞ্জ উপজেলার ধামাইনগর ইউনিয়নের কুস্তা গ্রামের সোলায়মান (৭৬) হোসেন বলেন, ছোটবেলায় এই এলাকাজুড়ে নানা আকারের তালগাছে ভরা ছিলো। এছাড়াও এই অঞ্চলে নানা প্রজাতির বিশাল বিশাল আকাশ ছোঁয়া গাছের দেখা মিলত। এখন সেসব বিশালাকৃতির গাছের আর কোন অস্তিত্বই নেই তবে কিছু কিছু তালগাছ রয়েছে।

তিনি আরও বলেন ছোটবেলায় তিনি বিভিন্ন উঁচু গাছের মগডাল বজ্রপাতে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার দৃশ্য অনেক দেখেছি কিন্তু এখন সেই বিশাল আকৃতির গাছ গুলো না থাকায় সে দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না। বিশাল আকৃতির গাছ না থাকায় বজ্রপাত হচ্ছে ফাঁকা জায়গায় যার কারনে কাজ করার সময় কৃষক ও সাধারন মানুষ মারা যাচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ সরকারী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর এস এম মনোয়ার হোসেন বলেন গ্রীন হাউজ নষ্ট ও পরিবেশ দূষনের কারণে এমন বিপর্যয় ঘটছে। এছাড়া পুরানো দিনের বিশালাকায় নানা প্রজাতির গাছ কেটে ফেলায় বজ্র সরাসরি জনবসতি এলাকায় পড়ছে।

তিনি আরও বলেন বজ্রপাত মহা দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক দিনে জেলায় বজ্রপাতে হতাহতের ঘটনায় কৃষক ও সাধারন মানুষ শঙ্গিত হয়ে পড়েছে। বজ্রপাতে হতাহতের ঘটনা রোধে বিজ্ঞান সম্মত ব্যবস্থা গ্রহন জরুরী।

এ বিষয়ে বেসরকারি সংস্থা এডিপির নির্বাহী পরিচালক কাজী সোহেল রানা বলেন, সিরাজগঞ্জ জেলা বজ্রপাত ঝুকির মধ্যে অন্যতম। গত বছরে কৃষক ও শ্রমজিবী মানুষদের বজ্রপাত সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন কর্মশালা পরিচালনা করা হয়েছে। তিনি এ ধরনের কর্মশালা বেশী বেশী করার উপর গুরুত্ব দেন ।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী মোঃ কামরুজ্জামান বলেন তালগাছ রোপণের মাধ্যমে বজ্রপাত থেকে অনেকটাই রক্ষা পাওয়া সম্ভব। তাই ২০১৮ সালে জেলায় বজ্রপাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষার জন্য তাল গাছ রোপন করা হয়েছিলো। আমারা এরই মধ্যে আরো তালের চারা রোপনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন পাঠিয়েছি।

সিরাজগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেন জানান ঝড় বৃষ্টির সময় উন্মুক্ত স্থান এবং গাছের নিচে আশ্রয় না নেয়া সহ এরই মধ্যে বজ্রপাতরোধে জনসাধারণের জন্য ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক ২০টি দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি জনসাধারণের নির্দেশনা মানার জন্য অনুরোধ জানান।

সিরাজগঞ্জ জেলা ত্রান ও দূর্যোগ কর্মকর্তা আব্দুর রহিম বলেন, বিগত বছর গুলোর তুলনায় এ বছর জেলায় বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। এরই মধ্যে গত দুই সপ্তাহে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে । তিনি গণসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে বজ্রপাত রোধক প্রযুক্তির ব্যবহার ও বৃক্ষরোপনের তাগিদ দেন ।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবু হানিফ বলেন, বজ্রপাত মহা দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ও সচেতেনতার অভাবে বজ্রপাতে হতাহতের সংখ্য বাড়ছে যা খুবই দুঃখ জনক। তিনি বলেন বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যুর সংখ্যাই বেশী। তাই বৃষ্টি ঝড়ের সময় ফাঁকা জায়গায় না থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা উচিত।

 

বিডি রয়টার্স/এসএস